• সোশাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দেয়ায় ৬ বছর জেল!
  • শাবিপ্রবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা সমাজকর্ম বিভাগের
  • বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
  • জবির ‘সি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার আসন বিন্যাস
  • নিজ কলেজে মাস্টার্স ভর্তিতে প্রাধান্য থাকছে
সর্বশেষ ২৪
সর্বাধিক পঠিত
স্কলারশীপ লিংক

অনলাইন জরিপ

পিএসসি প্রশ্ন ফাঁস হলেও পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তের সমর্থন করেন কি?

অথচ তিনি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন...
আনিসুল হক ॥ | 30-09-2013



 অথচ তিনি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন... সাবিরুল ইসলামের বক্তৃতা শুনছিলাম। ২৩ বছরের তরুণ, সিলেটের বিশ্বনাথে পৈতৃক বাড়ি। জন্ম, বেড়ে ওঠা ব্রিটেনে। পৃথিবীর তরুণতম উদ্যোক্তাদের একজন, ১৪ বছর বয়স থেকে তিনি নিজের উদ্যোগে ব্যবসা করা আরম্ভ করেন।

তিনি পৃথিবীর কনিষ্ঠতম কোটিপতিদের একজন। ২০১০ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন বিশ্বের কনিষ্ঠতম ২০ শিল্পোদ্যোক্তাদের একজন হিসেবে।

১৭ বছর বয়সে তিনি বই রচনা করেন, দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইয়োর ফিট। এখন তিনি ১০ লাখ তরুণের সামনে বক্তৃতা করার কর্মসূচি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশ, আট লাখ ৮৫ হাজারের সামনে কথা বলা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তিনি এসেছিলেন প্রথম আলো কার্যালয়ে। সিএ ভবনের মিলনায়তনে তরুণদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন। বসে বসে তাঁর কথা শুনছিলাম।

তিনি বলেন, ‘মা-বাবারা চান, ছেলেমেয়ে ডাক্তার হবে। পৃথিবীর সবাই যদি ডাক্তার হয়, রোগী হবে কে?’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে যাঁরা বাবা-মা হয়েছেন, তাঁদের বলি, নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের ওপরে চাপিয়ে দেবেন না। পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ ৭০০ কোটি রকম। প্রত্যেকেই আলাদা। প্রত্যেকের উচিত নিজেকে আবিষ্কার করা।’

এই কথাটিই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, স্বপ্ন নিয়ে পাতায় তাঁর সেই উক্তি আমি প্রকাশও করেছিলাম, ‘আমাদের অভিভাবকেরা একেকজন প্রতিভার ঘাতক, যে ছেলেমেয়ের আইনস্টাইন হওয়ার কথা, বাবা-মা তাকে বানাতে চান ইঞ্জিনিয়ার, যার রবীন্দ্রনাথ হওয়ার কথা, অভিভাবকেরা তাকে বানিয়ে ফেলেন ডাক্তার।’

সাবিরুল বাংলাদেশ সম্পর্কে যা বললেন, তা আমরাও বলে আসছি। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলছেন। ইউরোপে-আমেরিকায় ছবি আঁকার ক্যানভাসটা পূর্ণ হয়ে গেছে। ওখানে আর কারও কিছু করার নেই। বাংলাদেশে ক্যানভাসটা অর্ধেকটাই খালি। প্রত্যেকে একটা করে তুলি হাতে নিয়ে নিজের মতো রং লাগাতে পারে, অংশ নিতে পারে নিজের স্বপ্নের দেশ আঁকার কাজে। আসলেই আমরা এমন সৌভাগ্যবান, আমরা এমন একটা সময়ে এই দেশে আছি, যখন আমরা যে ভালো কাজটাই করি, সেটা জমা হচ্ছে দেশের অ্যাকাউন্টে, আমরা একটা দেশ গড়ছি। এই রকমের সৌভাগ্য আর কটা প্রজন্ম পাবে?

সাবিরুলের কথা শুনি। আর নানা কথা মনে হয়। বিল গেটসের একটা উক্তি পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। জানি না, কথাটা আদৌ তিনি বলেছিলেন কি না। উক্তিটা হলো, ‘আমি কয়েকটা পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। আমার এক বন্ধু সবগুলো পরীক্ষায় পাস করেছিল। সেই বন্ধুটা এখন আমার প্রতিষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে।’

বিল গেটস যে পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, সেটা সত্য। আর তিনি হার্ভার্ডের ঝরেপড়া ছাত্র। মানে যিনি পড়া শেষ করেননি। পরে কিছুদিন আগে বিল গেটসকে ডেকে নিয়ে হার্ভার্ড সম্মানসূচক ডিগ্রি দিয়ে নিজেরাই সম্মানিত হয়েছে। বিল গেটসের এই উদ্ধৃতিটা কিন্তু একেবারেই নির্ভেজাল, তিনি বলেছেন, ‘I really had a lot of dreams when I was a kid, and I think a great deal of that grew out of the fact that I had a chance to read a lot.’ ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার সত্যি সত্যি অনেক অনেক স্বপ্ন ছিল। আর এ স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, কারণ আমার অনেক অনেক পড়ার সুযোগ ঘটেছিল।’

পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আমি যখন সত্যজিতের পথের পাঁচালী দেখি, তখন অপু কেমন, দুর্গা কেমন, রেলগাড়ি কেমন, তার ছবি সামনে থাকে, কিন্তু যখন বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী দেখি, তখন আমার কল্পনা দিয়ে আমি অপুকে দেখি, দুর্গাকে দেখি, কাশবন দেখি, রেলগাড়ি দেখি। তখন কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা মনে মনে...

এফ আর খান। ফজলুর রহমান খান। বিশ্ববিখ্যাত স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। তাঁকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন। ঢাকা থেকেই পড়াশোনা করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠান থেকে, যা আজ বুয়েট নামে পরিচিত। আমেরিকায় গেছেন। আরও পড়াশোনা করেছেন। উঁচু ভবন নির্মাণের বিষয়ে নতুন ধারণা দিয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন। শিকাগো শহরের সিয়ার্স টাওয়ার তাঁর বানানো। বহুদিন সেটাই ছিল আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু ভবন। ফজলুর রহমান খান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ার জন্য অনেক শ্রম দিয়েছিলেন।

সিয়ার্স টাওয়ারের নিচে এফ আর খানের নামে সড়ক আছে। সেই সড়কে আছে তাঁর ধাতব ভাস্কর্য, আর সেখানে ধাতুর অক্ষরে খোদিত আছে তার বাণী—‘একজন প্রযুক্তিবিদের তাঁর আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাঁকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে পারতে হবে। আর জীবন হলো আর্ট, সংগীত, নাটক এবং সর্বোপরি মানুষ।’

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রকৌশলীদের একজন বলছেন আর্টের কথা, সংগীতের কথা, নাটকের কথা, আর সবার ওপরে বলছেন মানুষের কথা।

আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ছুটছি ইঁদুরদৌড়ে। প্লে গ্রুপে ভর্তি করানোর জন্যও কোচিং, অভিভাবকেরা গলদঘর্ম, এ কোচিং থেকে ও কোচিং। জিপিএ-৫ পেতেই হবে। শুনেছি, বাচ্চারা আর ইংরেজি গল্প বা কবিতা পড়ে না, ওয়ার্ডওয়ার্থের ড্যাফোডিল কিংবা তলস্তয়ের থ্রি কোশ্চেনস আর তাদের পাঠ্যবইয়ে নেই, এখন সাহিত্য নয়, পড়তে হয় শুধু স্ট্রাকচার। সর্বনাশ। একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। ‘তোমার বাবার নাম কী?’ ‘তিনটা নাম বলেন। আমি সঠিক নামটাতে টিক দিয়ে দিচ্ছি।’

আমার আব্বার কথা মনে পড়ছে। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পড়াতেন শিশু মনোবিজ্ঞান। বাসায় আব্বা ঘুরঘুর করতেন আর বলতেন মনীষীদের উক্তি, শিশুকে প্রকৃতির বুকে ছেড়ে দাও। প্রকৃতিই শিশুকে শিক্ষা দেবে।

আমরা তা-ই করেছি। বর্ষাবস্ফািরিত নদীতে গিয়ে কখন যে সাঁতার শিখেছি, জানিও না। একদিন নৌকা বেয়ে পাঁচ-ছয় বছর বয়সে আমার এক সমবয়সী বন্ধুসমেত চলে গিয়েছিলাম করতোয়া নদীর ওই পারে, নদীর তীরে পড়ে আছে একটা ডিম, হাঁস পেড়ে রেখেছে, সেই ডিম এনে...

আব্বার ছিল ডায়াবেটিস। তিনি মিষ্টি খেতে পারতেন না। আমাদের ভাইবোনদের নিয়ে যেতেন রংপুরের বড় মিষ্টির দোকানটায়। অর্ডার দিতেন, বড় বড় মিষ্টি দাও। তখন ছয় টাকা করে ইয়া বড় মিষ্টি পাওয়া যেত। আমরা মিষ্টি খাচ্ছি। আব্বা দেখতেন। আব্বার মিষ্টি খাওয়া হয়ে যেত।

আব্বা মারা গেছেন, আমি যখন বুয়েটে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আব্বার মৃত্যুর কথা ভেবে আমি এখনো কাঁদি। তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, আমার ছেলেমেয়েদের কেউ মারতে পারবে না। আর ওরা যা করতে চায়, তা-ই করতে পারবে।

আব্বার পাঁচ ছেলেমেয়ে কেউই তো বখে যায়নি। তিনি বলতেন, অলসভাবে শুয়ে-বসে থেকো না। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। বই পড়ো। শোনো, পৃথিবীতে কোনো খারাপ বই নেই।

আমরা একটা কাজ করতে যাচ্ছি। আজকের দিনটা খুবই একটা বিশেষ দিন আমার জন্য, আমাদের কারও কারও জন্য। আমরা আজ বাজারে দিলাম কিশোর আলো। কিশোরেরা একটু দৌড়ঝাঁপ করুক, বইপত্র পড়ুক, যা খুশি তাই করুক। শুধু জিপিএ-৫ পেলেই হয় না। জগৎটাকে বড় করে নিতে হয়। নিজের মনটাকে সুন্দর করতে হয়। আর কল্পনাকে বাড়তে দিতে হয়। স্বপ্ন দেখতে পারতে হয়।

কিশোর আলোয় আমরা শিশুদের স্বপ্নের সলতেয় অগ্নিসংযোগ করে দিতে চাই। আপনাদের শুভেচ্ছা, পরামর্শ আর অংশগ্রহণ চাই।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

 

 

ডেইলিএডুকেশন.নেট’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Leave a Reply 

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

How much is: Answer: